শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

প্রকৃতি পরিবেশ ও ষড়ঋতুর বৈচিত্র্য

মুসফিকা আন্জুম নাবা
ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। বিশ্বের এক মহাবিস্ময়! কারণ, পৃথিবীর আর কোথাও ছয় ঋতুর সম্মিলন লক্ষ্য করা যায় না। খুব সঙ্গত কারণেই ষড়ঋতুর সংস্পর্শে আমাদের দেশের পরিবেশ ও প্রকৃতি রীতিমত বৈচিত্র্যময়। মূলত, ইতিবাচক প্রকৃতি ও পরিবেশ শুধু মানবজীবনের নয় বরং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় খুবই অত্যাবশ্যকীয়। আর প্রকৃতি ও পরিবেশকে সুন্দর, গতিশীল ও প্রাণবন্ত রাখার জন্য প্রয়োজন হয় নানাবিধ অনুষঙ্গের। মূলত, প্রকৃতি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের এক অবিস্মরণীয় আশীর্বাদ হল ‘পুষ্পসম্ভার’। হাজার হাজার বছর ধরে ফুলকে সৌন্দর্য পবিত্রতা ও বিশুদ্ধতার প্রতীক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ফুলের অপূর্ব নান্দনিকতা আমাদের হৃদয় রাঙিয়ে দেয়। বাহারি সব রঙ, মনমাতানো সৌরভ, রকমারি আকৃতি ফুলের অনন্য সৌন্দর্য আমাদের মন রাঙিয়ে দেয়। লাল-নীল, গোলাপি-হলুদ, সাদা-বেগুনি ইত্যাদি বিচিত্র্য রঙের ফুল রয়েছে আমাদের পৃথিবীতে। মূলত, ফুলের সৌন্দর্য আমাদের জীবনকে রাঙিয়ে তোলে। ফুলের গন্ধে ভরে যায় বাতাস; এর উপস্থিতি আমাদের চারপাশে আনন্দের আবহ সৃষ্টি করে। ফুলের ইতিহাস মানবসভ্যতার সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। ফুলের ইতিহাস সঙ্গে ওৎপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে শিল্প, বিজ্ঞান, ধর্ম ও সংস্কৃতি।
প্রাচীনকাল থেকে প্রাচীন মিশর, গ্রীস এবং রোমে ফুলকে ধর্মীয় কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। আবার বিভিন্ন ধর্মীয় সংস্কৃতি, পূঁজা-অর্চনা, জন্মদিন এবং অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানে ফুলের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। যদিও ইসলামে ফুলের পুঁজা বা উপাসনার কোন সুযোগ নেই। এছাড়াও অফিস এবং বাসাবাড়ির সাজসজ্জায় ব্যবহৃত হয়ে থাকে। প্রাচীনকাল থেকে ফুল নিয়ে অনেক মিথ প্রচলিত রয়েছে। যেমন, গ্রিক দেবী আফ্রোদিতি তার প্রেমিক  অ্যাডোনিসের মৃত্যুতে কাঁদলে, তার কান্না আর অ্যাডোনিসের রক্ত থেকে নাকি তৈরি হয়েছে এনিমোন ফুল। মিশরীয় ও চীনা সংস্কৃতিতে এনিমোন এ পাংশু রঙের কারণে অসুস্থতার প্রতীক মনে করা হয়। আবার ভিক্টোরিয়ান সংস্কৃতিতে এনিমোন ফেলে আসা ভালোবাসার প্রতিনিধিত্ব করে।
আইরিশ ফুলকে গ্রিকদের রংধনুর দেবী আইরিশের নামে নামকরণ করা হয়েছে। বেগুনি আইরিশ জ্ঞানের প্রতিনিধিত্ব করে। পৃথিবীতে দেশ ও অঞ্চলভেদে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ফুল যা মানুষকে করেছে বিমোহিত, উজ্জীবিত ও অণুপ্রাণিত। বহুকাল ধরে কবি-সাহ্যিত্যিকরা ফুল নিয়ে তৈরী করেছেন অসংখ্যক ছড়া কবিতা সাহিত্য গল্প প্রবন্ধ; যার মাধ্যমে নির্মিত হয়েছে আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতি ও সভ্যতা।  কবিরা তাদের রচনায় ফুলের সৌন্দর্য ও অনুভূতি প্রকাশ করে থাকেন। কবি লিখেছেন :
‘ধনধান্য পুষ্প ভরা        আমাদের এই বসুন্ধরা’
ফুল সৌন্দর্য ও মানবজীবনের আন্তঃসম্পর্কের চিত্র তুলে ধরে। বাংলাদেশে ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে বিভিন্ন ফুল ফুটে ওঠে। এসব ফুলের রাজকীয় সৌন্দর্য প্রকৃতিকে রাঙিয়ে তোলে। বিভিন্ন ঋতুতে আমাদের দেশে বাহারি রকমের ফুলের দেখা পাওয়া যায়। ঋতু ভিত্তিক কিছু বিশেষ ফুলের কথা নিচে উল্লেখ করা হলো:
১. গ্রীষ্মকাল : এ কালের ফুলের মধ্যে রয়েছে-গাঁদা ফুল, জুঁই, পান্না, জেসমিন, চম্পা, চন্দ্রপ্রভা , জারুল সহ বিভিন্ন রঙের সব ফুল।
২. বর্ষাকাল : কাজলকালো আকাশের কারণে বর্ষার ফুলগুলোর আকষর্ণ অন্যরকম। এ কালে ফোটে- কদম, সাদা কাঠগোলাপ, শাপলা, দোলনচাপা প্রভৃতি। বর্ষার ফুলের সৌন্দর্য সবাইকে মুগ্ধ করে।
৩. শরৎকাল : শরৎকে ঋতুর রাণী বলা হয়। কারণ, এই ঋতুতেই প্রকৃতি সাজে নানা সব রঙে। কাশফুল, বকুল ফুল, শিউলি, গোলাপ, শেফালী, ছাতিম, মিনজিরি সহ অনেক ধরনের ফুল শরতে পাওয়া যায়। রঙিন এসব ফুলে প্রকৃতি হয়ে ওঠে ফুলের রাজ্য।
৪. হেমন্তকাল : শরৎকালের পর এই ঋতুর আগমন হয়। এই ঋতুতে ফোটে বকফুল, অশোক, মল্লিকা ,কামিনী, গন্ধরাজ, হিমঝুরি প্রভৃতি।
à§«. শীত : শীতকালীন ফুলগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছেÑগাদা, ডালিয়া, সুর্যমুখী, কসমস, চন্দ্রমল্লিকা, ভারবানা, জিনিয়া, লুপিন, অ্যাস্টার সহ অসংখ্য ফুল।
৬. বসন্তকাল : ঋতুর রাজা বসন্ত। সারা বছর বিভিন্ন ধরনের ফুল দেখা গেলেও বসন্তকালে এর সংখ্যা অনেক বেশি। যেমন : কৃষ্ণচূড়া, কনকচাপা, নয়নতারা, শাল, শিমুল, মহুয়া, মনিমালা, দেবকাঞ্চন ইত্যাদি। এসব ঋতুর এই ফুলগুলো বাংলাদেশের প্রকৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে আবির্ভুত হয়। ঋতুভিত্তিক ফুল ছাড়াও প্রকৃতিতে অসংখ্য ফুল রয়েছে।
এখন ফুল বাণ্যিজিকভাবে চাষ করা হয়। ১৯শ শতকের পর থেকে ফুল চাষ শিল্পে রূপ নেয়। আমাদের দেশে অনেকেই বাণিজ্যিকভিত্তিতে ফুলচাষ অনেকেই সাবলম্বীও হয়ে উঠেছেন। ইউরোপ ও আমেরিকার কিছু দেশে ফুলের চাষ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। ফুলের ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতি চাষ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে স্থান পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ গোলাপ, গাঁদাফুল, টিউলিপ, এবং অন্যান্য এই জাতীয় ফুলগুলি বিশ্বব্যাপী বিখ্যাত। বাংলাদেশেও গোলাপ, গাঁদা, জুঁই, শিউলি, পদ্ম ফুলসহ অনেক প্রজাতির ফুল বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হচ্ছে। বাংলাদেশে উৎপাদিত ফুল বিদেশে পাঠানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।
ফুল প্রকৃতির এক অপূর্ব সৃষ্টি, যা সৌন্দর্য, এবং জীবনের প্রতীক। ফুলের ইতিহাস মানবজীবনের বিভিন্ন দিকের সাথে জড়িত। এটি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের একটি উপাদান নয়, বরং মানব সম্পর্কের গাঢ়তা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও প্রতীক। এই ফুলের রাজ্যের নান্দনিকতা আমাদের পরিবেশকে আরও সুন্দর ও শৈল্পিক রূপ দান করে। ফুলের সৌরভ আমাদের হৃদয়ে আনন্দের দোলা দেয়। পরিশেষে বলা যায়-
ফুলে ফুলে সাজানো পৃথিবীর কোণা,
রঙিন স্বপ্নে ভরে ওঠে প্রতিটি প্রহর।
আমাদের প্রত্যেকের জীবন হয়ে উঠুক ফুলের মত সুন্দর ও সৌরভময়। এজন্য প্রয়োজন সুন্দর ও সুকুমারবৃত্তির নিরবচ্ছিন্ন চর্চা। তাহলেই জীবন, প্রকৃতি ও পরিবেশ ও ষড়ঋতুর বৈচিত্র্যে বর্ণিল হয়ে উঠবে। প্রাণবন্তু হবে সবকিছু।
লেখিকা : শিক্ষার্থী, জয়পুরহাট সরকারি মহিলা কলেজ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ